সিলেটে দুজনকে ঘিরেই যত আলোচনা

প্রকাশিত: ৪:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৩

সিলেটে দুজনকে ঘিরেই যত আলোচনা

কাল ভোটের পরীক্ষা দুই সিটিতে

সব হিসাব-নিকাশের যবনিকাপাত ঘটছে আজ। রাত পোহালেই সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে মেয়র পদে আটজন প্রার্থী থাকলেও মূলত দুজনকে ঘিরেই আলোচনা সবচেয়ে বেশি। তন্মধ্যে আওয়ামী লীগের আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর পক্ষেই ভোটের পাল্লা ভারী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জরিপেও তিনি এগিয়ে। তবে জাতীয় পার্টির নজরুল ইসলাম বাবুল হাল ছাড়তে নারাজ। তিনি মনে করছেন, লাঙ্গলের পক্ষে নীরব ভোট বিপ্লব হবে। এদিকে, টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। নগরীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার। এ ছাড়া নির্বাচনে সিংহভাগ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। এ দুইয়ে মিলে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করে কিনা, এ নিয়ে আছে উৎকণ্ঠা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সিসিকের এবার নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় প্রার্থী হননি টানা দুবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এতে পথ সুগম হয় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর। তবে জাতীয় পার্টির বাবুল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ মাহমুদুল হাসান আটঘাট বেঁধে মাঠে নামায় ভোটের হিসাব ত্রিমুখীতে রূপ নেয়। তবে বরিশালের নির্বাচনের পর ইসলামী আন্দোলন সিলেটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। তাদের প্রার্থীও মাঠ থেকে সরে যান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিমুখী লড়াইয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব ও জোর দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভোটের পাল্লা আনোয়ারুজ্জামানের পক্ষেই ভারী হওয়ার আভাস মিলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্যবারের চেয়ে এবার সিলেট সিটি নির্বাচনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্যবার স্থানীয় পর্যায়ের নানা কোন্দলের কথা শোনা গেলেও এবার তা প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। স্থানীয় সব নেতা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারণা তো চালিয়েছেনই, তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারাও দফায় দফায় যোগ দিয়েছেন। নগরীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত চষে বেড়িয়েছেন তারা। আওয়ামী লীগের এই সম্মিলিত প্রয়াস ভোটের মাঠেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটারকে নিজেদের পক্ষে টানতেও বিশেষ প্রচেষ্টা ছিল আওয়ামী লীগের। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ইশতেহারও নজর কেড়েছে ভোটারদের। নগরবাসী কী চান- সেদিকে নজর দিয়ে দলটি এবারের ইশতেহার তৈরি করেছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। এদিকে, মাঠের জরিপেও নৌকার দিকে পাল্লা ভারী। ইউরোপভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন মেন্যুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা) সিলেট নগরীতে ৫২ দিন কাজ করে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেছে। জরিপ অনুসারে, ভোটের হিসেবে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় ১ লাখ ভোটে এগিয়ে থাকবেন আনোয়ারুজ্জামান।

সব হিসেবে এগিয়ে থাকলেও শেষমুহূর্তের প্রচারণায় কোনো ঢিল দেননি আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। বৃষ্টির মধ্যে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গতকাল দিনভর প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন তিনি। সামগ্রিক বিষয়ে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘নির্বাচনী কার্যক্রমের শুরু থেকেই গোটা নগরবাসী আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। তাদের সেই আস্থা ভোটের দিনেও থাকবে বলে আমি দৃঢ় আশাবাদী।’ তিনি বলেন, ‘সিলেটে জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যা আছে। এগুলো দূর করতে প্রয়োজন মাস্টারপ্ল্যান। আমি একশ বছরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করতে চাই। সেটা বাস্তবায়নে প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা। যেহেতু সরকারে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা আছেন, নির্বাচিত হলে আমি তাঁর কাছে যাব এবং তাঁর বিশেষ সাপোর্ট পাব বলে বিশ্বাস করি। সাধারণ মানুষও মনে করছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, সিলেটে দলটির মেয়র থাকলে আরও বেশি উন্নয়ন হবে।’ আনোয়ারুজ্জামান আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ডিজিটাল করেছেন এবং দেশকে স্মার্ট করতে চান। এই স্মার্ট দেশের প্রথম স্মার্ট নগরী হিসেবে আমি সিলেটকে গড়ে তুলতে চাই। আমি নির্বাচিত হলে নগর ভবন হবে সবার। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, সব শ্রেণি- পেশার মানুষ সেখানে সমান সুযোগ পাবেন।’

এদিকে, আওয়ামী লীগের দিকে পাল্লা ভারী হলেও শেষ না দেখে হাল ছাড়তে নারাজ জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল। জাতীয় পার্টি মনে করছে, বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভ থেকে মানুষ লাঙ্গলে ভোট দেবে। এ ছাড়া নগরীতে যারা নীরব ভোটার, যারা নির্দিষ্ট দলের প্রতি আকৃষ্ট নন, তাদের ভোট পাওয়ার আশা করছে সংসদের বিরোধী দলটি। এর বাইরে বিএনপিদলীয় অনেক ভোটও লাঙ্গলে পড়বে বলে তাদের ধারণা। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতীয় পার্টি। প্রশাসনকে নিয়েও আছে তাদের অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে গতকাল ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন নজরুল ইসলাম বাবুল। নগরীর দক্ষিণ সুরমায় প্রচারণকালে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, তবে লাঙ্গলের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। সিসিক নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সরকার প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো তামাশার চেষ্টা করা হয়, তবে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা ঘরে বসে থাকবে না।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে, পেশি শক্তির প্রয়োগও চলছে। কিন্তু পবিত্র এই নগরীর নাগরিকগণ ২১ জুনের নির্বাচনে সব ষড়যন্ত্রের সমুচিত জবাব দেবেন ইনশাআল্লাহ।’

বন্যা ও কেন্দ্র ঘিরে শঙ্কা : গত কয়েকদিন ধরে সিলেটে বৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে উজানের ঢল যুক্ত হয়ে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি না থামায় পরিস্থিতি যাচ্ছে খারাপের দিকে। সিলেট নগরীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতার। অনেকের বাসা-বাড়িতে উঠে পড়েছে পানি। আজও যদি বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, পানি বাড়ে, তবে নাজুক পরিস্থিতিতে আগামীকালের ভোটে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার শঙ্কা আছে। এ ছাড়া নগরীর অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকা অনুসারে, ১৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টি ঝুঁকির তালিকায়। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের সরব উপস্থিতি থাকবে কিনা, এ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। তবে ভোট নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। সিলেটের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমদ বলেন, শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ করতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা আছে। আমি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো কেন্দ্রে পানি ওঠে গেলে তাৎক্ষণিক নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ