আজও হয়নি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই চিন্তানিবাস

প্রকাশিত: ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২৩

আজও হয়নি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই চিন্তানিবাস

নিউজ ডেস্ক : পাখির কুহুতান, নীরব প্রকৃতি, স্নিগ্ধ বাতাস আর দৃষ্টির শেষ অবধি অপার সৌন্দর্যের স্বর্গদ্বীপ মনপুরা। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজে দ্বীপটি। অবস্থান ভোলা শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে সাগরের বুকে। নয়নাভিরাম নিসর্গ বুকে ধারণ করা দ্বীপটির পরতে পরতে রয়েছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির হরেক গাছ। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে মনপুরা একটি ভ্রমণস্বর্গ। এই জনপদটি হয়ত বিগত পাঁচ দশক আগেও এমনই সুন্দর ছিল। আর তাইতো এ জনপদের মায়ায় আটকে যান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালে সংঘটিত এক ঘূর্ণিঝড়ের পরে মনপুরা গিয়েছিলেন তিনি। তখন মনপুরায় একটি ‘চিন্তানিবাস’ গড়ে তোলার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে দেশে লাখো উন্নয়নের উদাহরণ সৃষ্টি হলেও আজও হয়নি মনপুরাকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছেপূরণ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই চিন্তানিবাস, কবে বাস্তবিক রূপ পাবে সেটাই এখানকার মানুষের প্রশ্ন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ভোলা সাইক্লোন আঘাত হানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায়। সেই বন্যার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয় মনপুরাসহ আশেপাশের অনেক এলাকা। এ সময় মনপুরার অসহায় মানুষের পাশে লঞ্চযোগে ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু। বন্যা পরবর্তী ১৭ নভেম্বর সেখানে হাজির হন তিনি। মনপুরার রামনেওয়াজ নদীর ঘাটে খালি গায়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান স্থানীয় মরহুম বসরাত উল্লাহ চৌধুরী। পরে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে সেখানে ত্রাণ বিতরণ করেন।

চারদিকে মেঘনা নদী বেষ্টিত সারি সারি কেওড়া গাছ, পাখির কলকাকলিতে মুখর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন বঙ্গবন্ধু। তখন তিনি চিত্তবিনোদন ও অবকাশকালে সময় কাটানোর জন্য মনপুরায় চিন্তানিবাস স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চিন্তানিবাস স্থাপনের জন্য বঙ্গবন্ধু ইট, বালু, সিমেন্ট ও রড পাঠিয়েছিলেন। কাজও শুরু হয়েছিল। রামনেওয়াজ বাজার সংলগ্ন বড় দীঘির পাশে চিন্তানিবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মৃত্যু হয় চিন্তানিবাসেরও।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিক্রমায় কেটে যায় দীর্ঘ সময়। তবে মনপুরায় আজও নির্মাণ হয়নি সেই চিন্তানিবাস। বর্তমানে নতুন করে আবার দবি উঠেছে চিন্তানিবাস প্রতিষ্ঠার। স্থানীয়দের এই দবির পেছনে আরো একটি কারণ রয়েছে। তারা মনে করেন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তানিবাসই এ জনপদের প্রতি ওপরমহলের দৃষ্টিপাতের কারণ হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তানিবাস হতে পারে, পুরো মনপুরার রক্ষাকবচ। কারণ, বর্তমানে ভালো নেই এই জনপদের বাসিন্দারা। সব সময় ভাঙন আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটে তাদের। ভাঙনের চোখ রাঙানিতে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে মেঘনা বেষ্টিত এই জনপদটি। দিনের পর দিন ভেঙে যাচ্ছে মনপুরা।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে, চারটি ইউনিয়নের দেড় লাখ জনসংখ্যা নিয়ে মনপুরা উপজেলা গঠিত। হাজিরহাট সদরের একটি অংশ ও রামনার মাথা এলাকায় ব্লক ফেলার কারণে কিছুটা ভাঙন রোধ হয়েছে। এ ছাড়া ওই ইউনিয়নের সোনারচর, চরজ্ঞান, দাসের হাট, মনপুরা ইউনিয়নের কুলাগাজীর তালুক, সীতাকুণ্ড, ঈশ্বরগঞ্জ, সাকুচিয়া উত্তর ইউনিয়নের মাস্টারহাট বাজার সংলগ্ন পশ্চিম অংশ, সাকুচিয়া দক্ষিণ ইউনিয়নের রহমানপুর গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।

স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব বেড়িবাঁধ অনেকটাই ভেঙে গেছে। রামনা, হাজীরহাটে পুরাতন কোনো বেড়িবাঁধ এখন আর টিকে নেই। হাজীরহাট ইউনিয়নের পূর্ব অঞ্চলে ও ফয়জোদ্দির দুইটি ওয়ার্ডে পুরাতন একটি বেড়িবাঁধ এখনও আছে। মোটের উপর ৭৭ কিলোমিটার পুরাতন বেড়িবাঁধের তিনভাগের দুইভাগই বিলীন হয়ে গেছে। বাকি যা আছে তাও ভাঙনের মুখে। মনপুরার ঈশ্বরগঞ্জ, সোনারচর, লঞ্চঘাট এলাকাসহ পূর্ব পাশ ধরে জংলারখাল পর্যন্ত বহু মানুষ এরইমধ্যে হারিয়েছে তাদের বসতভিটা, ফসলি জমি । অন্যদিকে কাউয়ারটেক থেকে হাজীরহাট পর্যন্ত ভাঙন রয়েছে। এরই মধ্যে পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান মনপুরা ফিসারিজ ভাঙনের কারণে শেষ।

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্বাস বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বীপটিকে খুব পছন্দ করতেন। স্বপ্নের মনপুরায় বঙ্গবন্ধুর চিন্তানিবাস করার স্বপ্ন ছিল। বঙ্গবন্ধুর পছন্দের দ্বীপটি আজ বিলীন হতে বসেছে। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি মনপুরাকে বাঁচাতে এখন শক্তপোক্ত বেড়িবাঁধ জরুরি। যদি আজ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিঘেরা চিন্তানিবাস থাকত, তবে হয়ত দেশের মানুষ, প্রশাসন, মিডিয়ার ভালোবাসাময় দৃষ্টিপাত থাকত এই দ্বীপের প্রতি। বেঁচে থাকা দ্বীপটুকুর প্রতিটি মাটির কনাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমারা চাই, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মনপুরা বেঁচে থাকুক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণের চিহ্ন নিয়ে।’

এ বিষয়ে মনপুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭০ সালের বন্যার পরে বঙ্গবন্ধু মনপুরায় এসেছিলেন। ঐ সময় তিনি এখানে একটি চিন্তানিবাস করতে চেয়েছিলেন। এ বিষয়ে বহুবার স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। তবে অজ্ঞাত কারণে আজও এই চিন্তানিবাস নির্মাণ বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষাপটে আমরা জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছি।’

নদী ভাঙনের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যে মনপুরাকে বঙ্গবন্ধু এতটা ভালোবাসতেন সে মনপুরাকে এত সহজে বিলীন হতে দেওয়া যাবে না। তাই ছোট ছোট মেরামত বাঁধ নয়, বরং সম্পূর্ণ মনপুরার সীমানায় বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কোভিডের কারণে এ প্রকল্প আটকে থাকায় অনেকটা ক্ষতি হয়েছে। আমরা আশাবাদী প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে মনপুরাবাসী রক্ষা পাবে। পাশাপাশি আশা রাখি, খুব তাড়াতাড়ি মনপুরাবাসী দেখতে পাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই চিন্তানিবাস।’